Header Ads

Header ADS

লেখক ও বর্বর

লেখক ও বর্বর


দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা 
তরুণ কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক

ছবি - সংগ্রহ

যুগ যুগ ধরে লেখকরা সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। বাঁচিয়ে রাখেন ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য। তুলে ধরেন জাতি ও সমাজকে। লেখক স্বপ্নদ্রষ্টা, লেখক পথপ্রদর্শক। লেখকই সংস্কারক, ঘুণে ধরা  তন্দ্রালু সমাজকে ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে তুলেন। অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে কলম ধরেন। মানবপ্রাণে সঞ্চার করেন প্রেরণা। এই লেখকগণই আবার উপহার দিয়ে থাকেন এমন লেখনী যা মানুষের সুষ্ঠু মনোরঞ্জনের খোরাক। প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করতে এবং তার মর্মার্থ খুঁজে নিতে শিখান। ঘোর তমসায় প্রদীপ শিখা হয়ে জাজ্বল্যমান থাকেন। গারো ভাষায় সেই গানের মতো 'চাকিগিতা নাতেংজক' অর্থ্যাৎ 'প্রদীপের মতো উদ্ভাসিত'। 

এক জন লেখক খেয়ে না খেয়ে, দিন-রাত চোখের ঘুম হারাম করে, একের পর এক নিরলসভাবে খাটাখাটুনির পর সৃষ্টি করেন অনবদ্য রচনা। এর পিছনে ব্যয় করেন প্রচুর সময়, তার থেকেও বড় বিষয় কতোটা মানসিক শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়। এই বই, সেই বই ঘেঁটে, নানান জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, কতো কিছু বিশ্লেষণ করে, সূক্ষ্ম বিচার-বিবেচনার পর জমাকৃত তথ্য সন্নিবেশিত করে এক এক করে স্তরে স্তরে সাজিয়ে যান তাঁর সুনির্দিষ্ট বিষয়াবলী। এর পিছনে কিন্তু অনেক সময় লেখকের নিজের পকেট থেকেও খসাতে হয় গচ্ছিত যৎকিঞ্চিত আমানতের অর্থ, যা লেখকের খেয়েপরে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য বহুমূল্য কিছু। দিনের পর দিন এক এক করে তৈরি হতে থাকে কথামালা। আর শেষে অনেক পরিশ্রমের সেই ফসল তাঁর প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা ইত্যাদি। 

অবশ্যই ভালোবাসা থেকেই তিনি সেই কাজগুলো করেন। কিন্তু এতে লাভ? লেখকের লাভ বিশেষ কিছু কি থাকে? অর্থ সমাগম কি ঘটে বানের জলের মত? নিন্দুকেরা তবু খুঁজে বেড়াবেন কিছু একটা, জানি। বলবেন যশ-খ্যাতির জন্যে এতোকিছু। নিন্দুকেরা যাই বলুক সমাজের দশজনই কিন্তু উপকৃত হয় সমৃদ্ধ লেখনীতে। যা হারিয়ে যায় তা ফিরিয়ে আনার এক মহৎ ডাকের সমুদ্রবৎ সুবিশাল কর্মযজ্ঞে একটি বিন্দু হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বর্তমানের শ্যাওলা পরিষ্কার করে সমাজের জীবন-ঘাটের সোপান পরিষ্কার করে আমাদের হেঁটে যাবার পথ করে দেন। হাতছানি দেয় সম্মুখের লাল টকটকে সূর্য☀। তিনি হাত ধরে নিয়ে চলেন। 
ছবি - সংগ্রহ

এতোসবের মাঝেও অপবাদ দেওয়ার মতো লোক থাকে, থাকবে। নিজেরা সমাজকে অলস, অবশ করে দেওয়ার চক্রান্তে নামে। সাধুবেশে স্বার্থসিদ্ধির এক ঘোর ধান্দাবাজির খেলায় নেমে পথভ্রষ্ট করতে চায় জাতি, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিকে। চলৎকে থামিয়ে দেয়, প্রয়োজনে অপরাধ জগতে ডুব দিয়ে তার সাফাইও গাইতে নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। গলা টিপে হত্যা করে ঘুণ নিয়ে আসে এই যে নিন্দুকগোষ্ঠী, এরাও কিন্তু লেখক। পথভ্রষ্ট, বিকৃতমনষ্ক একদল বুদ্ধিজীবী নামধারী। সুদর্শন চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এদের বিকৃত, অস্বাভাবিক রুচি।  

যারা সৃষ্টি-নির্মাণ কিংবা সৃষ্টি পালনের নামে ধ্বংসপ্রবাহ বইয়ে দেওয়ার নীলনকশা আঁকে, সেইসব নকলবাজদের জাতি ও সমাজ চিনে নিতে ব্যর্থ হলে তখনি পতন ও পশ্চাৎপদতার আভাস পাওয়া যায়। আর আজ যারা তাদের পিছু নেয়, পিছনে ছুটে তাদের গায়েও লেগেছে (নাকি লাগিয়েছে?) অপরাধের, অপরাধ জগতের কটু গন্ধ!

অন্ধত্ব ঘুচিয়ে যারা বাইরের এক আলোকোজ্জ্বল বিশ্বের দর্শনদান করান সেই লেখকগণের তিল তিল করে গড়ে তোলা মহাশ্রমের সৃষ্টিকে যারা নিমিষে হাতের মুঠোয় পুরে চেপে পিষ্ট করে মেরে ফেলে, এরা সেই গোষ্ঠী যারা সৌন্দর্য চিনে না। সৌন্দর্যের মাহাত্ম্য বুঝে না। সত্য এদের কাছে নেই, মিথ্যা যাদের একমাত্র মোক্ষম অস্ত্র। মঙ্গলের শত্রু, এরা কখনো আদর্শ হতে পারে না। 

অনবদ্য সৃষ্টিকে যারা পদদলিত করতে পিছপা হয় না, দিন দিন তিলে তিলে গড়ে উঠা সৃষ্টিকে যারা নিমিষে ভস্মে পরিণত করে এরা কারা?
বর্বর???

No comments

Powered by Blogger.