Header Ads

Header ADS

বই পোকা


বই পোকা

সোনার খাঁচায় সোনালী দিনগুলি

দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা


ছবি: শুক্ল প্যাট্রিক ম্রং

কত দিন গেছে সকাল ৯টা থেকে শুরু হত বই পড়া, আর শেষ হত পরের দিন ভোর ৫টায়। মাঝে বিরতি বলতে নাওয়া-খাওয়া। গোটা বই আগাগোড়া পড়ে শেষ করে তবে প্রশান্তি। আস্ত একটা বই গিলে ফেলা যেনো। বই না পড়লে নাওয়া, খাওয়া, ঘুম কোনটাতেই শান্তি নেই। 

দিনকে দিন এক এক করে শেষ করেছি রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি, নৌকাডুবি, চোখের বালি, গোরা, যোগাযোগ, শেষের কবিতা, চতুরঙ্গ, ছোটগল্পসহ আরও অন্যান্য রচনা/উপন্যাস। 

বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, সমরেশ, সুনীল, শীর্ষেন্দু, হুমায়ুন, জাফর ইকবাল এমনকি বাদ যায় নি জুলভার্ন, শার্লক হোমস, জেমস বন্ড,  মাই লাইফ (বিল ক্লিন্টন), ফেলুদাও। বইয়ের তালিকায় আরো ছিল আগাথা ক্রিস্টি, ম্যাক্সিম, তলস্তয়, বার্ট্রাণ্ড রাসেল প্রমুখ লেখকগণের অনবদ্য সব রচনা। যাক, আর তালিকা দিয়ে কাজ নেই। বইয়ের তালিকা মূখ্য যেমন নয় তেমনি তালিকা শুরু করলে শেষও হবে না, বইয়ের তালিকাতেই সব ভরে যাবে। 

সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, সায়েন্স ফিকশন, গল্প, কৌতুক বা রম্য সব ধরণের বই-ই পড়ে নিতাম। ভালো কোন বই চোখের সামনে পড়ে গেলে আর তার রক্ষে নেই, বই খানা নিজের হস্তগত না করা পর্যন্ত মনে এতটুকু শান্তি নেই।
টিউশনির টাকা বাঁচিয়ে হত আমার বই কেনা। কোন কোন সময় মনে হত আমি টিউশনি করছিই এই বই কিনতে। 

খুব ভালো লাগত যখন বই পড়ুয়া কোন বন্ধু জুটাতে পারতাম। কারণ, উভয়ে যখন গল্পগুজব করতাম তখন আড্ডার প্রসঙ্গ থাকত আদ্যোপান্ত শুধু বই। বই পোকাদের সাথে বই নিয়ে আলাপ-আলোচনা না হলেও প্রসঙ্গ থাকত জাতি, সমাজ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, অধিকার, চলমান রাজনীতি, খেলা, চলচ্চিত্র, ধর্ম, আমাদের অগ্রসরতাসহ সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বহুমুখী বিষয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন, উপভোগসহ প্রকৃতির নির্মল, অনুপম স্পর্শে হারিয়ে যাওয়াটাও ছিল আমাদের বিশাল এক দায়িত্ব। 

জমজমাট সেই সব আড্ডায় কি আর বোরিং ফিল বলতে কিছু থাকে যখন সেখানে মজার কিছু চুটকিও থাকে। তবে, এই সব আড্ডায় নেতিবাচকতার কোন স্থান ছিল না। নৈরাশ্যবাদ, সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, একপেশে কোন চিন্তাভাবনারা ছিল যথাযথ বর্জিত। ইতিবাচক, মুক্তচিন্তারই ছিল কেবল অবকাশ। সাথে চা-কফি, বাদাম, পুড়ি-সিঙ্গাড়া, নেমকি-পিঁয়াজু কিংবা গ্রামের মুড়ি ভর্তা প্রভৃতি মুখরোচক কিছু সামনে পরিবেশিত হলে তো আর যাই কোথা। মেয়ে বন্ধুরা আবার আম, জাম, বাতাবি লেবু যোগাড় করতে পারদর্শী ছিল। সেই বন্ধুদের খুব মিস করলেও তারা কে ছিল, কোথায় আছে সব স্মৃতিরা কেমন যেন গুলিয়ে যেতে শুরু করেছে। 

আজও, বই পোকারা আমার যতই অল্পবয়েসী  হোক, তাদের সাথে খুব সহজেই বন্ধুত্বটা ঠিক জমে উঠে।
সেই সময়গুলিতে গারো লেখকদের বই খুব কমই পাওয়া যেত। যা মনে পড়ে, সঞ্জীব দ্রং, সুভাষ জেংছামের বইগুলিই কেবল পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। অন্যান্য বইগুলি ততটা সহজলভ্য ছিল না।  অন্যান্য লেখকদের লেখা পড়ার জন্য বিভিন্ন পত্রিকা/ম্যাগাজিনের দ্বারস্থ হতে হত। 

বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস)-এর "খু-পান্থে" পত্রিকাই প্রথম পত্রিকা যেটি ছোটবেলায় আমার মনে দাগ কেটেছিল, আমার মনে নাড়া দেয়। আমার প্রাথমিক জীবনে আমার বহুল পঠিত ম্যাগাজিন। আমি প্রত্যেকটাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম এবং পড়তাম। যতদূর মনে পড়ে সভাপতি অঞ্জন ম্রং, সভাপতি অনিষীম সাংমা প্রমুখ সভাপতির বাণীও মনোযোগ সহকারে পড়তাম। বিভিন্ন শিরোনামে বাণীগুলো দেওয়া হত। এরকম এক শিরোনাম মনে পড়ে (ভুলও হতে পারে কারণ সেই কপিগুলো আমাদের কাছে আর নেই)- "সভাপতির টেবিল থেকে"। আমি জানি না, খুব সম্ভব আমার মা "খু- পান্থে" পত্রিকাটি নিয়ে আসতেন, আর আমি আমার দখলে নিয়ে নিতাম। যুদ্ধংদেহী বীর গারোদের ইতিহাস, পাঁচটি গারো অধ্যুষিত থানার স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবী, গারো মেয়ে বনাম বাঙ্গালি ছেলে প্রেম ও এর করুণ পরিণতিসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় সচেতনতামূলক জ্ঞান আহরণ করতে পেরেছিলাম সেই ছোটবেলা থেকেই "খু-পান্থে" মারফত। 

এছাড়া, গারো জ্ঞানী-গুণীদের কথা কোন সেমিনারে গিয়ে শুনে আসতে হত কিংবা তাঁদের কথা শুনার জন্য নিজেই সেমিনার/কনফারেন্সের আয়োজন করতাম। যেহেতু উঠতি যুবক,   টগবগে, তাই মুহুর্তেই আয়োজন করতে পারতাম। তবে, এখনও কিন্তু যুবক/তারুণ্যের কোঠা পেরোয় নি। বরং বলা চলে পূর্ণ যুবক। এই কোঠা পেরোতে আরও দশ বছর লাগবে আশা করি। এই যুবাকালেই পড়তে পারছি স্বনামধন্য, গুণী বিভিন্ন গারো লেখকের বই। আজ সেগুলি সহজলভ্য। বড়ই আনন্দের, আমাদের জাতির অনেক বড় পাওয়া। আমাদের লেখকগণের নিজস্ব প্রকাশনীও আছে। শুধু প্রয়োজন পাঠকের।

সকলের কাছেই আমরা ঋণী। শ্রদ্ধাস্পদেষু-
মণীন্দ্রনাথ মারাক, সুভাষ জেংছাম, মতেন্দ্র মানখিন, হেমার্সন হাদিমা, সরোজ ম্রং, জেমস জর্ণেশ চিরান, সঞ্জীব দ্রং, প্রয়াত বিভা সাংমা (ম্রং), সুমনা চিসিম, বচন নকরেক, বাবুল ডি নকরেক, ফিডেল ডি সাংমা, পরাগ রিছিল, মিঠুন রাকসাম, কার্তিক ঘাগ্রা, লেবিসন স্কু এবং শ্রদ্ধাস্পদ অন্যান্য সকল কবি, লেখক, গবেষকগণের কাছেই আমরা ঋণী
যিনিরা আমাদের জন্য এক এক করে বন্দ্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন।

যখন সেন্ট এণ্ড্রোজ বয়েজ হোস্টেল, হালুয়াঘাটে ছিলাম তখন হোস্টেল কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক আচিক শিক্ষা ক্লাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি অবাক হয়ে সিনিয়র ভাইদেরকে আচিক ভাষায় অনর্গল কথা বলে যেতে দেখেছি। আমারও খুব লোভ হত আচিক ভাষায় অনর্গল কথা বলতে। সবে ভাঙ্গা ভাঙ্গা আচিক ভাষায় কথোপকথন এবং প্রার্থনা করা শিখছি, এর মধ্যে দু' বছরের মাথাতেই আমাকে হোস্টেল ত্যাগ করতে হল অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে। খুব কষ্ট হয়েছিল, অনেকদিন মিস করেছি সেই আচিক ক্লাশগুলো। আফসোস রয়েই গেলো।

বলছিলাম বই পড়া প্রসঙ্গে।
আজ সেই ধুম নেই। ইচ্ছে করলেও সময় ফাঁকি দিয়ে সেই দিনে ফেরত যেতে পারি না।
সেই দিনগুলি আবার কবে আসবে, কবে ফিরবে। ইচ্ছেমত বই পড়ার, যত খুশি বই পড়ার। সেই দিনগুলি আবার ফিরে আসুক। সোনার খাঁচার সোনালী দিন।

No comments

Powered by Blogger.