আচিক (গারো/মান্দি) লিপি (গারো লোককাহিনী
আচিক লিপি
(গারো লোককাহিনী)
মূল সংগ্রাহক: দেওয়ানসিং এস রংমুথু
ভাষান্তর: দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা
অনেক অনেক দিন আগে আচিক জাতি বাস করত মান্দালি (Mandale) নামে এক দেশে। সেখানে সুবিস্তৃত চমৎকারসব গ্রামেই ছিলো তাদের বসবাস। নিজেদের জন্য গড়ে তুলতো উঁচুতলবিশিষ্ট বিশাল বিশাল আবাস এবং তাদের দেব-দেবীর মন্দিরগুলোও ছিলো সুপ্রশস্ত। আচিকদের ছিলো নিজস্ব শিল্প-সাহিত্যকর্ম যা তারা নিজেদের লিপি বা বর্ণমালা দিয়ে লিখে রাখতো পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি গুটানো কাগজে।
সেই সময়ে, আচিকরা কারৌ (KARO) নামেও পরিচিত ছিলো, ছিলো বিত্ত-বৈভবে ঐশ্বর্যশালী, প্রাচুর্যপূর্ণ এবং সমৃদ্ধিশালী। ছিলো সুসভ্য এবং সংস্কৃতিবান একটি জাতি। জীবন-যাপন করতো একত্রে, নিজেদের রাজা কিংবা গোষ্ঠীপ্রধানদের অধীনেই। ব্যাবহার করতো নিজস্বজাত বৃহদাকার, সুদীর্ঘ মিল্লাম (দ্বি-ধার বিশিষ্ট খড়্গ), বল্লম, ঢাল, তীর-ধনুক, এবং চণ্ডাল (Matchlock) জাতীয় সব অস্ত্র-শস্ত্র। ধাতু-আকরিক খননের কাজসহ তা পরিশোধনপূর্বক লোহা এবং স্টিলের সরঞ্জাম তৈরিতে ছিলো পারদর্শী। ছিলো স্বীয় উদ্ভাবিত তাঁতে সুন্দর, সুন্দর, চমৎকারসব কাপড় বোনার স্বীয় শিল্পকর্ম। মনোবিজ্ঞানের প্রকৃত স্বরূপ (the truth of mental science) জানা ছিলো তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য যা তারা মুখস্থ করতো; কিন্তু ইতিহাসের এক দুঃসহ, দুর্দৈব সময়ে আচিকরা ভুলে গেলো এসবই। স্মরণ করছি সেই দুঃসহ ঘটনা।
কোন এক বছরে, অকস্মাৎ উত্তর হতে জংলিদের এক বিশাল যাযাবর দল আচিকদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। অদম্য প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুললেও আক্রান্তরা পরাভূত হলো বিশাল সংখ্যক শত্রুদের শক্তির নিকট দ্রুতগতিতেই। আচিকদের সুদৃশ্য, মনোরম, নয়নাভিরাম বাড়িঘর, চিত্রোপমসব গ্রামে হানা দিয়ে আগুনে সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিলো বেশুমার বুনো-বর্বর এই দল। ধ্বংস করলো সুসজ্জিত-সুশোভিত, অনুপম বাস্তুভিটে, জাঁকালো-গৌরবমণ্ডিত মন্দিরসমূহ, তৎসঙ্গে মূল্যবান রচনাসমূহের অধিকাংশই। সবশেষে, ঠাণ্ডা মাথায় নিধনযজ্ঞ চালিয়ে মৃত্যুমুখে পতিত করলো বীর, সাহসী আচিকদের অনেককেই।
অতর্কিত সেই প্রবল আক্রমণে বেঁচে যায় যারা, রাজাদের পরিচালনায় সেই জীবিতদের একটি দল চলে যায় আরুরংদি নদীর (Arurongdi River) পশ্চিমাংশের পর্বতকুলে। আসং তিব্বতগিরিতে৩ (Asong Tibotgiri) বসতি স্থাপন করে অপর একটি বিশাল দল। সম্পত্তিরূপে ছিলো মুল্যবানসব গুটানো চর্ম্মলিপি, যেসবে লেখা ছিলো তাদের ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক ক্রিয়া-কর্ম, রণনীতি, রহস্যবিদ্যা (esoteric practices), প্রশাসন-সংক্রান্ত তত্ত্ব, এবং শিল্প-সংক্রান্ত (Industry) সব জ্ঞানাবলী।
সময়ের ধারায়, দিন কে দিন শুষ্ক হতে লাগলো তিব্বতগিরি, যে তিব্বতগিরিই ছিলো বিক্ষিপ্ত আচিকদের আশ্রয়স্থান। ধীরে ধীরে উৎপাদন বন্ধ হতে হতে উর্বর জমিগুলো পরিণত হলো পরিত্যাক্ত অনুর্বর জমিতে। বৃষ্টিপাত হয়ে গেলো দূর্লভ। অঙ্কুরোদ্গম ঘটে না আর বীজে। রুক্ষ-শুষ্ক-তাপদগ্ধ ধান, ভূট্টা, জনার প্রভৃতি ফসলি জমি। অক্ষম সে ধান ও কার্পাস ফলনে; দুর্ভিক্ষ-আকাল ও অনাহারের মুখে আচিক জাতি। দুর্ভাগা তিব্বতগিরি ত্যাগ করে, তাই, তাদের যাত্রারম্ভ সূর্যাস্তের অভিমুখে। পথে সাময়িক যাত্রাবিরতি গারওয়ার ব্রি-তে। গারওয়ার ব্রি-তেই ফুরিয়ে যায় তাদের সঞ্চিত সব খাদ্য। নতুন এই স্থান ঠাণ্ডা ও অনুর্বর। চারদিকে জনশূন্য, তুষারস্তুপের মাঝে খাবারের খোঁজ নেই কোথাও। তুষারাবৃত গাছগাছালি এবং ঝোপঝাড়ে অস্বস্তিকর এক দৃশ্যপটের সৃষ্টি, প্রতিভাত হয় ভয়ানক অপচ্ছায়ারূপে।
খাবারের অভাবে ঘটলো বহু বীরের মৃত্যুবরণ। 'রূপখণ্ড' (Rupakhund) সেই স্থানের নাম, যার অর্থ রূপালী শুভ্র বৃত্ত। ভয়ানক ক্ষুধায় প্রাণ রক্ষার্থে গুটানো মুল্যবান সব চর্ম্মলিপির সিদ্ধ দিয়েই অবশিষ্টদের ক্ষুধা নিবারণ অনিচ্ছাসত্ত্বেও। দুর্দশায় ও দ্বিধাদ্বন্দ্বময় বিশৃঙখল অবস্থায় ভুলে যায় নিজেদের অধিকাংশ মূল্যবান সব রহস্যবিদ্যা। অবশেষে, পতিত-জনশূন্য গারওয়ার ব্রি পরিত্যাগ করে পাহাড়ের পাদদেশে এগিয়ে গিয়ে পেলো একটি উর্বরা, সুজলা-সুফলা দেশের খোঁজ এবং সেখানেই স্থাপন করলো বসতি। দয়াময়ী প্রকৃতির মমতার আঁচলে তুলনামূলকভাবে সহজ জীবন পেয়ে শারীরিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় দিক দিয়েই তারা হলো অলস প্রকৃতির।
![]() |
| বর্তমান যুগে এসে মান্দি (গারো) সমাজের চারি পণ্ডিত ব্যক্তি আচিক লিপি প্রবর্তনের প্রয়াস চালিয়েছিলেন। উপরোল্লিখিত ছবি দুইটি এর সংগৃহীত নমুনা। |
নব্যস্থানে খাদ্য ও আশ্রয়ই ছিলো আচিকদের প্রথম ভাবনা। অবশ্য-প্রয়োজনীয় এসব চাহিদা পূরণেই ছিলো, তাই, তাদের নিরলস পরিশ্রম। সুখাদ্যের প্রাচুর্যে, আরামপ্রদ আবাস-নিবাসের সংস্থান দ্বারা বেঁচেবর্তে থাকার পূর্বশর্ত সম্পন্ন হলে পরবর্তী পর্যায়ে মর্মবেদনায় স্মরণে এলো চমৎকার সব তাদের গুটানো চর্ম্মলিপি, দুঃস্বপ্নের সেই সব মুহূর্তে যা ছিলো তাদের ক্ষুধা নিবারণের একমাত্র সম্বল ও প্রাণ রক্ষাকারী। বীর আচিকদের পেয়ে বসলো হারানো রচনাগুলি পূণরুদ্ধারের তীব্র বাসনা।
পূণরুদ্ধারে মনোনিবেশ করতে চাইলো পূর্বেকার সৌন্দর্য অবিকল বজায় রেখেই। কিন্তু হায়! পরিতাপে পরিতাপেই তাদের আবিষ্কার, প্রিয় বর্ণমালা যে ততোদিনে সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত! অতীত কলা, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার কথাই কেবল আছে যে স্মরণ। এই সেই সময়, যে সময় হতেই যে আচিকরা লিপিহারা অক্ষরবিহীন জনগোষ্ঠী।
- শান্তা গাবিল কর্তৃক কথিত, সিংলিমারি, দরং ডিস্ট্রিক্ট, আসাম
পাদটীকাঃ
১. মান্দালিঃ সম্ভবত, ব্রহ্মদেশে (বার্মায়) গারোদের প্রাচীন একটি দেশ। এমনও হতে পারে, প্রাচীন কোন গারো গ্রাম যা বর্তমানে আধুনিক শহর “মান্দালে”- তে উন্নীত হয়েছে।
২. আরুরংদি নদীঃ ব্রহ্মদেশে (বার্মায়) ইরাওয়াদি নদীর প্রাচীন গারো নাম।
৩. আসং তিব্বতগিরিঃ বর্তমান আধুনিক তিব্বতের প্রাচীন গারো নাম।
৪. গারওয়াল ব্রিঃ আক্ষরিক অর্থে, গারওয়াল পর্বত। এটি সম্ভবত হিমালয়ের আধুনিক গারওয়াল পর্বতমালাকে বলা হয়েছে।



No comments