Header Ads

Header ADS

দম্বি ওয়ারি (গারো লোককাহিনী)


দম্বি ওয়ারি


গারো লোককাহিনী

মূল সংগ্রাহক: দেওয়ানসিং এস রংমুথু
ভাষান্তর: দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা 


বহুপ্রাচীন যুগের কথা। সেকালে আচিকদের মাঝে আচিকল্যাণ্ডে রংদিক নদীর তীরে এক গ্রামে বাস করতো জরেং নামের এক ব্যাক্তি। তার স্ত্রী ছিলো অপরূপ সুন্দরী, দম্বি নাম তার। বলা হয়, সে ছিলো আচিকদের রেমা মাহারীর (মারাক গোত্রের একটি উপগোত্র) মেয়ে। প্রকৃত অর্থে দম্বি ছিলো চারপাশের সমস্ত অঞ্চলে সেরা সুন্দরী। জরেং প্রায়শ সগর্বে তার সৌন্দর্য্যের গুণগাণ প্রকাশ্যেই করতো এই বলে যে, সেই যুগে এমন কোন সুন্দরী নেই তার প্রিয়তমা স্ত্রীর সৌন্দর্য অতিক্রম করবে। 

একদিন রংদিক নদীর গভীর খাদের ধারে একদল স্বদেশীয়ের কাছে জরেং চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে নিজ স্ত্রীর সুকৃতি ও গুণাগুণের উচ্চকিত প্রশংসা করছিলো। ক্রমে গোপন কথাও অজ্ঞতাবশত ফাঁস করে ফেললো যে দ্বিতীয় সন্তান জন্মদানের পরও তার স্ত্রীর তারুণ্য তখনো সমান কমনীয় এবং অতুলনীয়। এক মৎসনারীর জোয়ান পুত্র খাদের তলদেশে গভীর কুহরেই বাস করতো। গর্বিতমনা লোকটির বুক ফুলানো কথাবার্তা তার কর্ণগোচর হলে দম্বি সত্যিকারে কতোটা সুন্দরী জানার জন্যে বদ্ধপরিকর হলো। সেইমতো, দম্বি কখন জল তুলতে আসবে তার অপেক্ষায় খাদের অগভীর স্থানে নিজেকে লুকিয়েও রাখে।
ছবি: শিল্পী সালাস মানখিন


অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই দম্বি সেই খাদের ধারে আসলো। দম্বিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তরুণ মৎসকুমার তার প্রেমে পড়ে যায়। তাই, স্নানার্থে নদীতে নামার পরমুহুর্তেই কালবিলম্ব না করে তরুণ মৎসকুমার দম্বিকে হরণ করে খাদের তলদেশে জলদ আস্তানায় নিয়ে গেলো। এ প্রসঙ্গেই এখনো আচিকদের দৃঢ় বিশ্বাস যে বিশেষ শক্তিবলে মৎসকন্যা, মৎসপুরুষ, অথবা জলমানবরা ডাঙা থেকে জীবিত মানুষ কাওকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলে, সেই শক্তিবলে জীবিত বন্দীকে শ্বাস-প্রশ্বাসে সক্ষম রাখতে এবং ভিজে যাওয়া ও ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে সমর্থ। যার ফলে জরেঙের সুন্দরী স্ত্রী মৎসকুমারের সঙ্গে খাদের গভীরেও বেঁচেবর্তে ছিলো এমনভাবেই যেনো তখনো সে ডাঙ্গারই বাসিন্দা। এমনকি তখনও দম্বির সৌন্দর্যে ও লাবণ্যে ন্যূনতম তারতম্য ঘটে নি। 

দম্বির প্রথম সন্তানটি ছিলো কোমলমতি কিশোরী। সেই ছিলো মাতৃহরণের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী। মেয়েটি কাপড় দিয়ে তার শিশুবোন কে পিঠে করে বাঁধলো। মা'কে খাদের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখলেও প্রকৃত অবস্থাটি তখনো সে ভালো করে বুঝে উঠতে পারে নি। মনে করলো যে তার মা নিশ্চয়ই কোন কারণবশত গভীর জলে ডুব দিয়েছেন। ক্ষুধা পেয়ে শিশুটি চিৎকার করে কাঁদতে থাকলে মেয়েটি তাই খাদের ধারে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে তার মা'কে ডাকতে লাগলোঃ
“মা, ফিরে এসো, ছোট বোন কাঁদছে। ওকে খাওয়াতে হবে।”
দম্বি বড় মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে যেখানটায় তার মেয়েরা ছিলো নদীর সেই কিনারায় দ্রুতবেগে উঠে আসলো। তরুণ মৎসকুমারও পিছু নিয়ে দু'হাত দিয়ে তার শরীর শক্তভাবে ঝাঁপটে ধরে রাখে। কিন্তু, সুন্দরী রমণী মেয়েশিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জোর ইচ্ছা প্রকাশ করলে মৎসকুমার দম্বিকে দেহের উপরিভাগ ভাসাতে দিয়েই জলের নিচে পা দু'টো ধরে রাখলো। এভাবেই দম্বি শিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়াতে সক্ষম হয়। খাওয়ানো শেষ হলে মা বড় মেয়েকে বাড়ি ফিরে গিয়ে যত্নসহকারে শিশুটিকে আগলে রাখতে বলে দিলো। 

বাড়ি ফিরলে পর জরেং মেয়ের কাছে তার মা কোথায় গেছে তা জানতে চাইলো। উত্তরে মেয়েটি জানালো যে স্নান থেকেই তার মা আর ফিরে নি। এতে জরেং মনে করলো তার প্রিয়তমা স্ত্রীর জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। মায়ের গভীর তলদেশ থেকে ডাঙায় জীবিত ফিরে এসে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ঘটনা মেয়ের মুখে শুনে বাবা যে কোনমতেই বিশ্বাস করলো না। 
পরদিন মেয়েটি ছোট বোনকে পিঠে বেঁধে নিয়ে খাদের দিকে নেমে গেলো। বোনটাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্যে তার মা'কে আগের মতো করেই ডাক দিলো। এদিকে সত্যাসত্য নিশ্চিত করার কৌতূহল প্রশমিত করতে না পেরে জরেং কাছের বড় পাথরের পিছনে নিজেকে লুকিয়ে রাখে এবং অদম্য আগ্রহ নিয়ে পরবর্তী ঘটনা চাক্ষুষ করতে থাকে। জয় হলো তার কৌতূহলের। সে মেয়েটিকে দেখলো খাদের ধারে এগিয়ে গিয়ে তার মা'কে ডাকতে এবং পরক্ষণেই দেখলো জলের নিচে কোনোকিছুকে নড়েচড়ে উঠতে। চোখের পলকেই সুন্দরী স্ত্রীকে ঢেউয়ের উপর ভেসে উঠে শিশুটিকে বুকের দুধ খাওয়াতে দেখলো। দুঃখভারে জরেং তাকে আবার জলের তলদেশে অদৃশ্য হয়ে যেতেও দেখে। 

পরদিন জরেং স্ত্রীকে ফিরে পেতে সবলে শাণ দিয়ে মিল্লাম (দ্বি-ধার খড়্গ) চকচকে করলো। এমনভাবেই শাণ দিলো যে একটি মাছি এর ধারের উপর এসে বসার সঙ্গে সঙ্গেই দ্বি-খণ্ড হয়ে যায়; ঘষে-মেজে একে এমন উজ্জ্বল, চকচকে করলো যে দেখে মনে হলো বিদ্যুতের ঝলকানি। জরেং মেয়েকে বললো আবার আগের মতোই তার মা'কে ডাক দিতে; আর মিল্লাম হাতে সে নিজে খুব কাছেই লুকিয়ে রইলো। মেয়েটিও ঠিক তাই, তাই-ই করলো; শীঘ্রই দম্বির দেহ কোমর পর্যন্ত জলের উপরিভাগে উঠে আসে কিন্তু জলের নিচে মৎসকুমার শক্তভাবে তার পা দু'টো আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো। জরেং ক্ষিপ্রগতিতে লাফ দিয়ে তার স্ত্রীর হাত শক্তভাবে ধরে রেখে বেপরোয়াভাবে জলের নিচেরভাগ বার্নিশ করা মিল্লাম দিয়ে অনবরত খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হরণকারীকে ভয় দেখালো। খড়্গের ঝলকানি দেখে ভীত মৎসকুমার রূপসী বন্দীকে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। রূপবতী দম্বিকে উদ্ধার করে জরেঙের সে কি উল্লাস! মাটির উপর তার বিষম নৃত্য। উৎফুল্ল জরেঙের যৎপরোনাস্তি প্রচণ্ড হর্ষনাদ! মৎসকুমার তার বিজয়োল্লাস শুনতে পেয়ে মনে খুব ব্যাথা পেলো। সেও অবিলম্বে প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ নিয়ে নিলো। 
ছবি: মিল্লাম ও স্ফি, জাকগিত্তাল হ্যান্ডিক্রাফট সেন্টার

নিজেকে ও পরিবারকে অনিষ্টের আওতার বাইরে রাখার উদ্দেশ্যে জরেং সর্বনাশা নদী থেকে দূরে গাছের ওপর ঘর তৈরি করতে মনস্থ করলো। তাই, বড় একটি অশ্বত্থ গাছের (পিপল) ওপর বিশাল, সুন্দর বোরাং (গাছের ওপর নির্ম্মিত ঘর) তৈরি করে সেখানেই সে তার প্রিয়তমা স্ত্রী ও মেয়েসন্তানদের নিয়ে বসবাস করতে শুরু করে। কখনোই আর স্ত্রীকে কোন নদী কি ঝর্ণা কিংবা জলাশয় থেকে জল তুলতে যেতে দেয় নি। নিজেই সবসময় স্ত্রী ও মেয়েদের আহার্য ও স্নানাদির জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত জল বোরাঙে এনে তুলে রাখতো। তার এই ছোট্ট, সুখী সংসারে জরেং নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ বোধ করতো। পরিবারকে মৎসপুরুষ কিংবা অন্য যেকোন অনিষ্টকারী জলজ প্রাণীর নাগালের বাইরে রাখতে পেরে আত্মতুষ্টিতে নিজেকে বাহবাও দিতো। 
ছবি: বোরাং; ইন্টারনেট হতে সংগৃহীত


মৎসকুমার কিন্তু দম্বিকে ফিরে পেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই, পরিচারকদের সাথে করে সে দম্বির খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। ভৃত্য-দাসদের সঙ্গে সে দম্বির সন্ধানে যে পথ দিয়ে গেছে, সেই পদচিহ্ন এইদিনেও গারো পাহাড়ের আরুয়াকগিরি (Aruakgiri) ও নকাতগিরি (Nokatgiri) গ্রামে শণাক্ত করা যায় যা 'দম্বিখো আম্মানি রামা' (Dombiko Am.ani Rama), অর্থ্যাৎ দম্বিকে খোঁজার পথ নামে পরিচিত। অবশেষে সে দম্বির আবাসস্থল খুঁজে পেলো। আর, জরেঙের বোরাং যে বড় অশ্বত্থ গাছের ওপর ছিলো সেই অশ্বত্থ গাছ অব্দি ভূ-গর্ভে সুড়ঙ্গ খনন করলো। 

সাংক্নি (sangknies) নামের দৈত্যাকৃতির জলজ সর্প, বিরাটকায় ইল মাছ, বৃহদাকার কাঁকড়া, গুঁইসাপ, বড় বড় কুমির, এবং হাজার হাজার রাক্ষুসে বোয়াল ও শিং (sheng fishes) মাছ কে সুরঙ্গ খনন কাজে নিযুক্ত করলো যেনো নদীর গভীর খাদ হতে সেই বোরাং-এ পৌঁছানো যায়। নদীর জলশক্তিকে ব্যাবহার করে তারা কয়েক সপ্তাহেই সুড়ঙ্গ খননের কাজ সম্পন্ন করলো। অশ্বত্থ গাছের নিচের সব মাটি, পাথর ও এর বাতাবরণ সঙ্গে সঙ্গে নীরবে গভীর করে সরানো হলো, জলের সাহায্যে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সময়মতো এভাবেই নিকটবর্তী অঞ্চলের ভূ-গর্ভের খনন কাজ সম্পন্ন করে জলে পূর্ণ করা হলো। যে জল মাটির উপরিভাগকে ঠেস দিয়ে টিকিয়ে রাখলো। প্রতিহিংসাপরায়ণ মৎসকুমার নিচে যা সৃষ্টি করলো বাইরে বা উপরিভাগ থেকে সেই অনর্থ বোঝার কোন অবকাশই রইলো না। খলনায়ক এখন শেষ পরিণতির অপেক্ষায়।  

কোন এক গ্রীষ্মের রাতে সারারাত ধরে এমন অহর্নিশি বৃষ্টি হলো যে বন্যায় সব নদীই স্ফীত। ক্ষ্যাপা বৃষ্টির প্রচণ্ড প্রহারে ও প্রবল বাতাসের জোর গর্জনের মধ্যে এক মৎসপুরুষ জরেং-কে সতর্ক করলো যে সে এবং তার পরিবার ডুবে মরবে যদি না তারা তৎক্ষণাৎ বোরাং ছেড়ে দুরা পাহাড়ের (Dura Hills) চূড়ায় চলে যায়। জরেঙের পক্ষে এটি বিশ্বাস করা দুরূহ ছিলো। সে কোনোমতেই বুঝতে পারছিলো না যে কীভাবে অবাঞ্চিত কিছু ঘটতে পারে যেখানে নদী থেকে অনেক দূরে তাদের অবস্থান। তাই, আত্মপ্রসাদে ভুগতে থাকা একাধারে স্বামী এবং পিতা মৎসপুরুষের কথায় কর্ণপাতই করলো না। সে ও তার পরিবার বোরাঙের আশ্রয়ে থেকে আত্মতৃপ্তির আনন্দে ঘুমাতে গেলো, এবং যেখানে ছিলো সেখানে বিপজ্জনক কোন অবস্থার কথা কল্পনায়ও তারা ভাবতে পারলো না। 

পরদিন সকালবেলা গ্রামবাসীরা সেখানে ছুটে আসলো। কারণ তারা লক্ষ্য করেছিলো সেই অশ্বত্থ গাছ আর নেই, যার ওপরেই ছিলো সেই চমৎকার বোরাং। বিস্ময়াপন্ন হয়ে তারা দেখলো সেস্থানে এখন এক প্রকাণ্ড হ্রদ। গোটা পরিবারসহ জরেং ও তার গড়া বোরাং-কে নিয়ে ভূ-গর্ভে তলিয়ে গেছে সেই বিশাল অশ্বত্থ গাছ।
ছবি: দম্বি ওয়ারি, ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ

'দম্বি ওয়ারি' বা 'দম্বির হ্রদ' নামে পরিচিত এই হ্রদটি আচিকদেশের ইমানগিরি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এখনও দেখা যায়। 

- খালসান সাংমা রংমুথু কর্তৃক কথিত
গারো পাহাড়ের ইমানগিরি গ্রামে

পাদটীকা
১. রংদিক নদীঃ মাঝারি আকারের নদী; তুরা অঞ্চলের মেমিনরাম (Meminram) শৃঙ্গের দক্ষিণ-পূর্বাংশে যার উৎপত্তি। এটি গারো পাহাড়ে সিমসাং নদীর একটি শাখা নদীও। 

২. ইমানগিরিঃ গারো পাহাড়ে তুরা অঞ্চলের পূর্বাংশের দক্ষিণে অবস্থিত একটি আখিং ভূমি (উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভূমি) এলাকা। রংদিক নদীর ডান তীরে এই আখিং ভূমিতে অবস্থিত গ্রামের নামও।

No comments

Powered by Blogger.