Sunday, December 8, 2019

গাংবো নকমা চিপু রাজা

মূল সংগ্রাহক: দেওয়ানসিং এস রংমুথু
ভাষান্তর: দেবাশীষ ইম্মানূয়েল রেমা

কয়েক শতাব্দী আগে আচিক আসঙের (আচিক দেশ) দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে প্রাচীন একটি গ্রামে গাংবো নকমা নামে এক ব্যক্তি বাস করতেন, যেখানে একদল আচিক ল্যাংটা রাজা নামে তাদের অধিনায়কের অধীনে হালচাষ করত। গ্রামের নামটি বিস্মৃতির অন্তরালে মুছে গেছে, স্থানটি ঢেকে গেছে অনেক অনেক বছর ধরে বেড়ে উঠা গাছ-গাছালি, ঘাস ও লতাপাতায়। 
গাংবো নকমা ছিলেন অনেক ধনী ও প্রভাবশালী; ব্যাক্তিত্বে তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন, নৈপুণ্যপূর্ণ, বাস্তববাদী এবং আভিজাত্যময়। তাঁর গর্বিত জীবন-যাপনের দরুণ তিনি প্রতিবেশীদের বিরাগভাজন হয়ে উঠেছিলেন। বাইরে থেকে তাকে ভয় করলেও ভিতরে ভিতরে তারা তাঁর ধ্বংসই কামনা করতো। 
একদিন গ্রামের সকল মুরুব্বি গোপনে বৈঠক করে গাংবো নকমার বাড়িসুদ্ধ তাঁকে ও তাঁর পরিবার-পরিজনকে পুড়িয়ে ফেলার মতলব আঁটলেন। এই নীল নকশার লক্ষ্যবিন্দু যে ব্যক্তি তিনি এই সব ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়ে তাঁর সমস্ত ধন-দৌলত, রত্নরাজি লোকচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে কাছের বনে পুঁতে রাখলেন। অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সুবিধাজনক স্থানে একদম সরিয়ে রাখলেন। নিজে এমনভাবে চললেন যেনো চক্রান্তের বিষয়ে তিনি একেবারেই অজ্ঞ। 
পরদিন রাতে গাংবো নকমার শত্রুরা তাঁর বাড়ির দরজা বাইরে থেকে আঁটকে দিয়ে তাতে আগুন লাগিয়ে দিলো। যাহোক গাংবো নকমা পূর্ব-প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন তাই অক্ষত অবস্থায় পরিবারসহ বাড়ির পিছনের খোলা দেয়াল গলে পালিয়ে বাঁচলেন । পরদিন সকালে তিনি প্রায় এক সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত লোকের ভান করলেন। গ্রামবাসীদের উদ্দেশ্য করে বললেন যে তাঁর নিজের বলতে তাঁর বাড়ির এই ছাই-ই রয়েছে, কিন্তু খুব সহজেই তিনি এইসব ছাইকে বিশাল সৌভাগ্যে পরিণত করতে সক্ষম। তাই, তিনি এক ডজন কি তারও অধিক বস্তায় ছাই পুরে সেসব ছাইভর্তি বস্তা নিয়ে বাজারের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। যাহোক, পথে বস্তাসমেত সব ছাই তিনি নদীতে ফেলে দিলেন এবং ফেলে দিতে দিতে বিড়বিড় করে বললেন যারা তাঁর ঘর পুড়িয়েছে তারাও এইসব ছাইয়ের মতোই জলের তলায় তলিয়ে যাক।
এখন তাঁকে ছাই নিয়ে যেতে দেখেও ছাই নিয়ে তাঁর কী উদ্দেশ্য সে সম্পর্কে গ্রামবাসীদের সবিশেষ কোন আগ্রহই ছিল না। অধিকাংশই ভেবে বসেছিল যে  লোকটা ছাই গাদা করে বস্তায় ভরে বাজার-শহরে যাচ্ছে, এঁর মাথা একেবারেই গেছে। গাংবো নিজেই মাটি খুঁড়ে তাঁর সব টাকা এবং জহরৎ নিয়ে গর্বের সাথে প্রকাশ্য দিবালোকে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন। গ্রামের বাসিন্দা সবার সামনেই মুদ্রা গুণে দেখান তো সগর্বে নিজ জহরৎগুলো দেখান। প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁর হঠাৎ ধনপ্রাপ্তি দেখে ভীষণ অবাক।  শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তারা ভরা আগ্রহে জানতে চাইলো কীভাবে তিনি এই ধন-রত্ন লাভ করলেন। 
তিনি উত্তরে বললেনঃ
“বাজার-শহরে বিদেশী বণিকদের কাছে আমাদের আবাসস্থলের ছাইয়ের অনেক বড় চাহিদা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো যে আমার বাড়িটা পুড়েছে। পোড়া বাড়ির ছাই আমাকে আগের থেকে বরং আরও অনেক টাকা এনে দিলো।  তোমাদেরও মনে রাখা উচিৎ আপাতদৃষ্টিতে দুর্যোগ বলে যা ঠাওর হয়, তার আড়ালে প্রায়শঃ আশীর্বাদই যে লুকানো থাকে (দুর্ভাগ্যই সৌভাগ্যের মূল)।“
গাংবো গ্রামবাসীদের এমনই প্রবৃত্তি দিলেন যে তারা তক্ষুণি ভিতরে থাকা সমস্ত দ্রব্যাদি ও আসবাবপত্রসমেত যার যার আবাসস্থলী পুড়িয়ে দিয়ে সেসবের ছাই বস্তায় পুরে ফেললো। তারপর একসাথে বাজার-শহরে গিয়ে ছাই বিক্রি  করতে চাইলো। বাজারের লোকেরা সেই গ্রামবাসীদের পণ্যদ্রব্য দেখে উপহাসে ফেটে পড়লো এবং ছাইয়ের মতো এমন মামুলী জিনিস বিক্রি করতে চাওয়ায় তাদেরকে উন্মাদগ্রস্থ জ্ঞান করে তাদের দিকে চেয়ে রইলো। এতে গাংবোর বিরূদ্ধে আক্রোশে তারা একযুক্তি হলো। তারা রিক্তহস্তে বাড়ি ফিরে গিয়ে গাংবোর সমস্ত গবাদীপশু মেরে খেয়ে ফেলতে মনস্থ করলো। স্বয়ং গাংবোর সাথেই তাদের দেখা হয়ে যায়। তিনি বিনয়ের সাথে দুঃখ প্রকাশ করে তাদেরকে জানালেন যে ছাই ক্রেতা সেই বিদেশী বণিকগণ কিছুদিন হল এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি তাদের এও বললেন যে সত্যিই বিদেশী বণিকেরা তাঁর কাছ থেকে সারের জন্য ছাই কিনে নিয়েছিলেন, এবং এখন তাঁর উপরেই তাদের (গ্রামবাসীদের) যত ক্রোধের আগুন ঢেলে দেওয়া খুব স্বাভাবিক। তবে, তা হবে তাদের পক্ষে অনেক বড় ভুল। তিনি বললেনঃ
“যে বাজার থেকে আমি ধন-রত্ন বোঝাই করে নিয়ে এসেছি, সেই একই বাজার হতে আপনাদের খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে বলে আমি অনেক দুঃখ বোধ করছি। আমি যা বলেছি তা হলো আমার বাড়ির ছাই বিক্রি করে আমার অনেক অর্থ-সংগতি হয়েছে। আমি তো আপনাদেরকে নিজেদের বাড়িতে আগুনে লাগিয়ে দিতে বলি নি। আমি এও বলি নি যে আমার মত আপনারাও সেই এক সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। তাই দেখুন, আমি যে আপনাদের এই দুর্যোগের কারণ হবো, তা সেই দিল্লী কোন বহুদূর! প্রার্থনা করি আপনারা আমার অনর্থ কিছু করবেন না, আর নয়তো আপনাদেরকে অনেক ভোগান্তিই পোহাতে হবে।“
গাংবোর কোন অনুনয়-বিনয় তারা শুনলো না, কিন্তু বলপূর্বক তাঁর সব গবাদীপশু ছিনিয়ে নিয়ে জবাই করে ফেললো। গাংবো অনুনয় করলেন তাঁর প্রতি সদয় হয়ে নিদেনপক্ষে জবাইকৃত পশুগুলির চামড়াটা যেনো তাঁকে দেওয়া হয়। তারা গাংবোর এই অনুরোধ মেনে নিলো, যেহেতু চামড়াগুলি তাদের কোন কাজেই আসবে না। তিনি তাঁর গবাদীপশুর চামড়া নিয়ে সেগুলো রৌদ্রে শুকালেন, তার কতকগুলিতে ছিদ্র করলেন যেনো আরও অকেজো দেখায়, বাদবাকী দিয়ে শক্ত-পোক্ত ব্যাগ তৈরি করে এইসব সমেত দক্ষিণের পথে গ্রাম থেকে বেরিয়ে পড়লেন। 
অবিলম্বে, গাংবো খুবই অবস্থাসম্পন্ন এক কৃষকের কাছে গিয়ে পৌঁছালেন যিনি তাঁর বাড়ি থেকে কয়েকশত হাত দূরে হাল চাষ করছিলেন। গাংবো নিজেকে চামড়া ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেন, ভালো কি খারাপ সব ধরণের চামড়াই কিনে থাকেন জানিয়ে খাবার জল চাইলেন। কৃষক তাঁর বাড়ির দিক দেখিয়ে বললেন সেখানে তাঁর বাচ্চারা আছে তাঁকে জল দিবে। তৎক্ষণাৎ, গাংবো লোকটির বাড়িতে গিয়ে তাঁর ছেলেমেয়েদের কে  বললেন তাদের বাবা তাঁকে পাঠিয়েছেন  তাঁর ধনসম্পদ নিয়ে যেতে।  স্বাভাবিকভাবেই ছেলেমেয়েরা আগন্তুক কে তাদের বাবার অর্থ-কড়ি রাখার জায়গা দেখিয়ে দিতে অস্বীকার করলো। 
গাংবো কৃষকের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেনঃ
“ওরা বলে, ওরা দিবে না। ওরা বলে, ওরা দিবে না”
কৃষক চাষ-বাস নিয়ে ব্যাস্ত থাকায় এদিক-সেদিক কিছু ভাবলেন না যে তাঁর সন্তানেরা আগুন্তকের হাতে ঠিক কী-ইবা সোপর্দ করতে এতোটা নারাজ। তিনি সরলমনে ধারণা করলেন হয়তো বাচ্চারা লোকটিকে জল দিতে চাইছে না। তাই চাষের সময় ব্যবহৃত লাঠি সন্তানদের উদ্দেশে ঘুরিয়ে রাগতস্বরে চিৎকার করে বললেনঃ
“যদি তোমরা না দাও, তাহলে এই লাঠি তোমাদের পিঠে পড়বে। এই লাঠি!”
ছেলেমেয়েরা সুবোধ হয়ে অর্থ-কড়িতে কানায় কানায় ভর্তি মাটির বড় কলস গাম্বোকে দেখিয়ে দিলো। কিন্তু কলসটির মুখ ছিলো সিলগালা করা। গাম্বো দ্রুত সিল ভেঙ্গে  চকচকে মুদ্রাগুলি তাঁর ময়লাটে গোচর্ম্মের  ব্যাগে  ঢেলে সেগুলি চামড়ার টুকরো টুকরো ছিদ্রের  ভিতরে গুটিয়ে  নিয়ে  কৃষকের দিকেই হাঁটা ধরলো যেনো বাচ্চারা সন্দেহ না করে।  তিনি খাবার জলের জন্য লোকটিকে ধন্যবাদ দিলেন যা বাস্তবিক ছুঁয়েও দেখেন নি। নিজ গ্রামের দিকে আনন্দে হাঁটা ধরলেন, তিনি এখন আরও অনেক ধনী যেমনটী আগে কখনও ছিলেন না।   পথে ছিদ্র করা চামড়াগুলি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। 
গাংবো অবশেষে গ্রামে পৌঁছে গ্রামবাসীদের উপস্থিতিতেই চামড়ার ব্যাগ থেকে মুদ্রাগুলি ঢেলে তাদের চোখের সামনেই গুণতে শুরু করলেন। গাংবোর প্রদর্শিত বিশাল অর্থ দেখে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা আশ্চর্য হয়ে গেলো। তারা জানতে চাইলো কীভাবে সে এমন বিশাল অর্থ-ভাগ্য লাভ করলো। তিনি বললেনঃ
“যদি আপনারা ধনী হতে চান, তবে আপনাদের গবাদীপশুগুলো জবাই করুন। কোন কিছুই নষ্ট করবেন না। জবাইকৃত পশুর চামড়া ছাড়িয়ে সেগুলোতে ছিদ্র করুন; যত দ্রুত সম্ভব সেগুলি নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করুন। আপনারা আমার সব গবাদীপশু মেরে ফেলে আমাকে ধনী করে তুলেছেন। আপনাদের কারণেই তো ঠিক সৌভাগ্যের মুহূর্তে আমার পক্ষে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হয়ে উঠলো। ভাগ্যের জোয়ার যখন, তখন দুর্দশাও মানুষকে ধ্বংস করতে পারে না।“
সহজ-বিশ্বাসী গ্রামবাসীরা সোজাসুজি গিয়ে তাদের সব গবাদীপশু মেরে ফেললো, চামড়া ছাড়িয়ে রৌদ্রে শুকালো, সেগুলোতে ছিদ্রের পর ছিদ্র করে বাজারে বিক্রি করতে নিয়ে গেলো। তারা সবার সামনে চামড়া মেলে ধরল কিন্তু কেউই কিনলো না। অকেজো ছিদ্রিত চামড়া বিক্রির প্রচেষ্টা করিয়ে আদতে তাদেরকে বোকা-পাগল বলেই তিরস্কৃত করা হলো। 
 গ্রামবাসীরা যখন বাজারে গেলো, তখন গাংবোও তাদের ভ্যাবাচেকা অবস্থা দেখতে সেই একই স্থানে গেলেন। বাজারের প্রান্তে তিনি এক ভ্রাম্যমাণ কাপড় ব্যাবসায়ী কে দেখলেন। যদি ক্রয়কারীর বাড়ি পছন্দসই মানের হতো তবেই কাপড় ব্যাবসায়ীটি সচরাচর দামী, বিরল কাপড় বাকিতে বিক্রি করতো। এখন পথের ধারের কাছেই একগুচ্ছ সু-নির্ম্মিত বাড়ি ছিলো, বাড়ির মালিকেরা ছিলেন না,  প্রত্যেকেই ব্যাবসার কাজে বাজারে চলে গেছেন। এখনকার দিনের মত তখনও গ্রামবাসীদের জীবনে হাটবাজারের দিনটি তুঙ্গেই ছিল। বাড়িতে ছিলো বলতে শুধু ছেলেমেয়েরাই।
গাংবো এরই একটি বাড়িতে ঢুকে ছোট ছোট কতক ছেলেমেয়ের কাছে খাবার জল চাইলেন। ছোট শিশুরা জল নিয়ে আসলে তিনি বারান্দায় বসলেন। জলপান শেষে গাংবো ছোট শিশুদের সাথে এমনভাবেই খোলামেলা গল্প করছিলেন যেনো তারা তাঁরই সন্তান-সন্ততি। কাপড় বিক্রেতা এসে ছেলেমেয়েসহ লোকটিকে দেখে কাপড় বিক্রির অতিশয় আশায় এগিয়ে গেলো। গাংবোকে কাপড় দেখিয়ে তাঁর কাছে বিক্রি করার ইচ্ছা পোষণ করলো। গাংবো বিনয়ের সাথে জানালেন তাঁর সত্যিই নতুন কাপড় প্রয়োজন, কিন্তু সেই মুহূর্তে কেনার মতো নগদ টাকা তাঁর হাতে নেই। তৎক্ষণাৎ ব্যাবসায়ীটি অমায়িকভাবে তাঁকে মূল্যবান কাপড় বাকীতে দিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলো। গাংবোও সঙ্গে সঙ্গে সেই সদয় প্রস্তাব লুফে নিলেন।
এখন ব্যাবসায়ীটি স্থানীয় ভাষার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। সে গাংবোর নিজ বাড়িসহ তাঁর ও তাঁর পিতার নাম জানতে চাইলো। তাই, যে বাড়িতে বসে ছিলেন সেই বাড়িটি দেখিয়ে গাংবো বিনয়ের সাথে নিজের বাড়ি বলে পরিচয় দিলেন। তারপর কোনরূপ বিব্রতবোধ ছাড়াই তিনি তাঁর নাম বললেন, 'অনজাওয়া' যার অর্থ 'দিব না', এবং তাঁর বাবার নাম হিসেবে বললেন, 'মানজাওয়া' যার অর্থ 'পাবে না'। এই উভয় নামই ছিলো স্থানীয় ভাষার (Local Dialect)যার সাথে বিক্রেতার কোন পরিচয় ছিলো না। যাই হোক, সে আসল নাম জ্ঞান করেই 'অনজাওয়া' এবং 'মানজাওয়া' নাম দু'টো টুকে নিলো। গাংবোর হাতে সব থেকে দুর্লভ কাপড় তুলে দিলো; যত্নসহকারে বাড়িটি ও এর চারপাশ দেখে নিয়ে মনের আনন্দে চলে গেলো এই মনে করে যে এই যাত্রায় সে সফল হয়েছে। সে তার ক্রেতাকে জানিয়ে গেলো এক বছর পর কাপড়ের মূল্য নিতে ফিরে আসবে। কাপড়-বিক্রেতা কিন্তু এক বছর পর সত্যিই ফিরে এসেছিলো। সেই একই বাড়িতে এসে বাড়ির আসল মালিকের কাছে তার পাওনা টাকা ফেরতও চাইলো। বাড়ির মালিক 'অনজাওয়া' এবং 'মানজাওয়া' সম্পর্কে তার কোন জ্ঞান কিংবা পূর্বধারণার কথা শুধু অস্বীকারই করলো না, উপরন্তু রাগে-ক্ষোভে জেদী ব্যাবসায়ীকে কতিপয় প্রতিবেশীর সাহায্যে বেধড়ক পিটিয়ে অর্ধম্মৃত অবস্থায় পথের পাশে ফেলে রেখে চলে আসলো। 
এদিকে গাংবো বাকীতে কাপড়খানি কেনার পর সুন্দরভাবে বেঁধে সগর্বে গ্রামের বাড়িতে ফিরলেন। বাড়ি এসে বিরল কাপড়খানা পড়ে নিলেন, দেখে মনে হলো যেনো লোকটি বিয়ে করতে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে গবাদী পশুর ছিদ্রিত চামড়া বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে যারা প্রচণ্ড উপহাসের শিকার হলো সেই গ্রামবাসীরা গাংবোর প্রতি অগ্নিশর্মা হয়ে বাড়ি ফিরলো। পথে তারা জোর শপথ নিলো যেকোন নিষ্ঠুর উপায়ে সরাসরি শঠ-ধূর্ত লোকটিকে মেরে ফেলবে। তারা তাঁকে বেঁধে বাঁশের ঝুড়িতে পুরে গ্রাম থেকে অনেক দূরের পুকুরে ডুবিয়ে মারার সিদ্ধান্ত নিলো। এই উদ্দেশ্যে তাঁরা একটি বিশাল, শক্ত-পোক্ত ঝুড়ি তৈরি করলো। 
ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা বাড়ি পৌঁছে গাংবোকে নতুন কাপড়ে সজ্জিত দেখতে পেলো। তারা আর কোন বাক্যব্যায় না করে নীরবে তাকে বেঁধে ফেললো এবং ঝুড়িতে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলো। তারপর ঝুড়িটাকে নিয়ে দূরের পুকুরে বয়ে নিয়ে চললো। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে তারা ভীষণ ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত হয়ে পড়লো। বড় একটি বট গাছের নীচে তাদের খাবার সেরে নেওয়ার জন্য ঝুড়িটাকে পুকুরধারে রেখে কয়েকশ গজ দূরে তারা হেঁটে গেলো। দৃষ্টিসীমানার বাইরে তাদের চলে যাবার ঠিক পরমুহুর্তেই সেই পুকুরধার বরাবর এক রাখাল ছেলে আসলো এবং কৌতূহলী হয়ে অদ্ভূত ঝুড়িটাকে পরীক্ষা করে নিলো। রাখাল ছেলেটি প্রতিদিনই এই স্থানে তার গো-পালকে জল খাওয়াতে আসে। সেই দিন সে তার সঙ্গে প্রায় শয়েক গবাদীপ্রাণী নিয়ে এসেছিলো। 
রাখালটি গাংবোকে ঝুড়ির ভিতর দেখে জানতে চাইলো এর ভিতর তিনি কী করছেন। চতুর বন্দীটি খেদের সুরে জানালেনঃ 
“আমাকে আমার অনিচ্ছায় রাজার আদেশে নিয়ে আসা হয়েছে সুন্দরী রাজকন্যার বর করতে। রাজকন্যা পাগলের মতো আমাকে ভালোবাসেন, তাই রাজা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলপূর্বক আমাকে নিয়ে গিয়ে তাঁর রূপসী রাজকন্যার সাথে বিয়ে দিবেন। আমি তাঁকে ভালোবাসি না। রাজভৃত্যরা আমাকে এখানে একা রেখে গেছে। তারা ভালো করেই জানে যে আমি কোন উপায়েই এখান থেকে পালাতে পারবো না।“
ছেলেটি মুখে বড় হা নিয়ে শুনতে লাগলো, আর গাংবো বলেই চললেনঃ
“তারা রাজার প্রাসাদে ঘোষণা করতে গেলো যে আমাকে তুলে নিয়ে এসেছে যেনো বিবাহ উৎসবের প্রস্তুতি চলতে পারে। কোন সন্দেহ নেই আমাকে নিয়ে যেতে তারা রাজ-সওয়ারিসহ আরও লোকজন নিয়ে আসবে। প্রাসাদে পৌঁছালে পর বিপুল আনন্দ-সমারোহের মাঝে সুন্দরী রাজকুমারীর সাথে জোর করে আমাকে বিয়ে দেওয়া হবে যা আমার মর্মবেদনার। আমার অনিচ্ছায় রাজকুমারীকে বিয়ে করতে হবে বলেই আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম। তাছাড়া, আমি এক চাষীর সুন্দরী মেয়েকে ভালোবাসি। আমার চোখে সেই পৃথিবীর সবথেকে মিষ্টি মেয়ে, সবচেয়ে সুন্দরী, নিখাদ, সেই আমার প্রিয়তমা। আমি তাকেই, একমাত্র তাকেই আমার স্ত্রী হিসেবে পেতে চাই। রাজার কন্যাকে বিয়ে করে নিজেকে ক্ষমতা ও প্রাচূর্য্যে ঘেরা কল্পনা করতেই আমার গা শিউরে ওঠে। মন্ত্রী মহোদয় আমাকে বলেছেন যে আমি এই অগ্নিপরীক্ষা থেকে ছাড়া পেতে পারি যদি আমি আমার মতো কোন চাষা কিংবা তোমার মতো কোন রাখাল কে আমার পরিবর্তে দিতে পারি। এই পর্যন্ত আমি কাওকে পেলাম না যার সাহায্য পেতে পারি।“
সেই সময়গুলোতে রাখাল ছেলেটি ভীষণ কঠিন জীবন যাপন করছিলো, প্রতিদিন বিশাল বিশাল গো-পাল তাকে চরাতে হতো। গাংবোর বলা কথাগুলো শুনে সে অবাক হয়ে গেলো এবং ভাবলো যে লোকটা কতটা বোকা, শুধু আবেগের বশেই রাজকুমারীকে বিয়ে করতে অস্বীকার করছে। তৎক্ষণাৎ সে গাংবোকে বললোঃ 
“আমি যদি আপনার জায়গায় হতাম তাহলে এক্ষুণি প্রাসাদে উড়ে চলে যেতাম। আমাকে কেনই-বা আপনার পরিবর্তে পাঠাচ্ছেন না?”
“তবে জলদি” গাংবো বললেন। “যদি তুমি সত্যিই চাও, ঝুড়ির বাঁধন খুলে আমাকে বের কোরো; তোমার ছেঁড়া জামা আমাকে দাও, আর আমার এই ঝকঝকে বিয়ের কাপড় পড়ে নাও। ঝুড়িতে ঢুকে পড়ো, কিন্তু চুপ থাকবে। যখন রাজার চাকরেরা তোমাকে নিতে আসবে তুমি সারা চোখে-মুখে গভীর দুঃখের ভান করবে। আমি তোমার পরিবর্তে রাখাল হবো।”
অল্প সময়ের মধ্যেই ছেলেটি গাংবোর সাথে কাপড় বিনিময় করে, ঝুড়িতে ঢুকে নিজেকে শক্ত করে বাঁধতে দিলো। নিষ্পাপ রাখাল ছেলেটিকে তার ভাগ্যের কাছে ছেড়ে দিয়ে গাংবো নিজে কিন্তু গো-পালকে গ্রামের দিকে চরিয়ে নিয়ে যেতে তিলমাত্র দেরী করলেন না। 
নিজেদের ভোজনশেষে গ্রামবাসীরা যেখানটায় তাদের অসুখী শিকার কে রেখে গিয়েছিলো, সেখানটায় চলে আসলো। কোন পরখ না করেই তারা রূঢ়ভাবে ঝুড়িটাকে লাথি মেরে পুকুরে ফেলে দিয়ে যে জায়গায় ঝুড়িটা পড়লো সেখান থেকে উঠে আসা ক্রমাগত বুদবুদ দেখতে লাগলো, আর পৈশাচিক আনন্দে উল্লাস করতে লাগলো এই মনে করে যে অবশেষে তারা তাদের নির্ভীক শত্রুকে সরিয়ে দিয়েছে। তারপর নিজেদের গ্রামে ফিরে গেলো।
যাহোক, গ্রামবাসীদের আশ্চর্যের সীমা রইলো না যখন বাড়িতে ফিরে তারা ভালো ভালো অনেক গাভী, ষাঁড়, ও বাছুরের মালিকরূপে জ্বলজ্যান্ত গাংবোকে আবিষ্কার করলো। তারা বেকুব বনে গেলো, মুখে রা'টি পর্যন্ত বের হলো না। গাংবো তাদের এই বিস্ময়াবিষ্ট অবস্থা বুঝতে পেরে বললোঃ
“আমি অন্তর থেকে আপনাদের ধন্যবাদ জানাই যে আমাকে এই গো-পালের মালিক বনে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে মন্ত্রমুগ্ধকর! মন্ত্রমুগ্ধকর পুকুরের নীচে অপূর্ব একটি গ্রাম রয়েছে যেখানে প্রচুর পরিমাণে এমন ভালো ভালো গাভী, ষাঁড়, ও বাছুর পাওয়া যায়। তাদের মালিক বাঁশের আঁশের বিনিময়ে এমন গো-পাল দিয়ে দিতে একেবারেই উদগ্রীব, কারণ সেখানে বাঁশের আঁশের চড়া দাম কিনা। যদি আপনাদের কেউ পুকুরের গভীর তলদেশে যেতে সাহস করেন, নিজেদেরকে শক্ত করে বেঁধে যেনো কোন জলজ প্রাণী আপনাদের কোন হানি করতে না পারে, তবে নিশ্চয়ই একইভাবে গো-পাল লাভ করবেন।”
গাংবোর বলা কথায় কী আছে তা বোঝার মতো সহজ-বিশ্বাসী গ্রামবাসীদের ততোটা দূরদৃষ্টি ছিলো না। তাদের একজন বললোঃ
“এটাতো জ্বলজ্যান্ত এই আমার মতোই সত্য যে আমরা তাকে সবার সামনে নিজেদের হাতে ঝুড়ির ভিতর পুরে আমাদের শক্ত-পোক্ত পা দিয়ে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছিলাম। ঝুড়িটা যেখানটায় পড়েছিলো সেখান থেকে বুদবুদ উঠতেও আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। সে কীভাবে উদ্ধার পেলো তা ব্যাখ্যা করার মতো কোন কার্যকারণ জগতে নেই। এইবার সে অবশ্যই আমাদের কাছে সত্য বলছে।“
গ্রামবাসীরা সম্মতি জানিয়ে সবাই মাথা নাড়ালো; তারপর তারা নিজেদের জন্য বড় ঝুড়ি তৈরি করতে আরম্ভ করলো। যে জায়গায় গাংবোকে লাথি দিয়ে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো, ঝুড়ি বানানো হয়ে গেলে সেই জায়গায় নিজেরাই যার যার ঝুড়ি বহন করে নিয়ে এলো। তারা প্রচুর খাবার-দাবার ও চু নিয়ে এসে বিশাল গো-পালের প্রত্যাশায় যে গো-পাল শীঘ্রই তাদের হতে যাচ্ছে তারই আনন্দ-স্ফূর্তিতে ভূরিভোজন সেরে নিলো। আনন্দিত মনে তারা ঝুড়িতে ঢুকলো এবং হইচই করে গাংবোর হাতে নিজেদেরকে শক্তভাবে বাঁধতে দিয়ে লাথি দিয়ে জলে ফেলে দিতেও দিলো। পুকুরের তলদেশে সম্ভাব্য সুখী রাজ্যে পৌঁছানোর তাদের কী প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা!
গাংবো একে একে ঝুড়িগুলো শক্ত করে বাঁধলেন এবং অবশেষে সবকটা জলে গড়িয়ে দিতে দিতে চিৎকার করে বললেনঃ 
“এখন অবশেষে তোমরা সবাই নিজেদের হিংসায় ডুবে মরো।”
ঝুড়িগুলো যেখানে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়লো সেখানে অসংখ্য বুদবুদ উঠতে লাগলো। ইঁদুরের মতোই সেই গ্রামবাসীরা সকলেই তাদের বেকুব সহজ-বিশ্বাসের কারণে ডুবে মরলো।
গাংবো ফিরে গিয়ে গ্রামবাসীদের সম্পদ ও সম্পত্তি দখলে নিয়ে তাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের তাঁর প্রজা করলেন। পরবর্তীতে তিনি সম্পদশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে বেড়ে উঠলেন; দেশের একটি বিশাল এলাকা স্বাধীন আচিক দলনেতা হিসেবেই শাসন করতে ও সুখে জীবন যাপন করতে লাগলেন। তিনি সবসময়ই তার বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, ও দূরদৃষ্টির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। গাংবো নকমা চিপু রাজা সত্যিই এমন একটি নাম যে নাম অনেক অনেক বছর ধরে আচিকদের মাঝে গণ্য হয়েই র'বে।

-শেরসিং মারাক রাংসা কর্তৃক কথিত, বারেঙ্গাপাড়া, ডিস্ট্রিক্ট গারো হিলস

মূল গ্রন্থ:

THE FOLK-TALES OF THE GAROS
Compiled by
DEWAN SING RONGMUTHU, B.A. (Hons.)
Published by the University of Gauhati in the Department of Publication
FIRST EDITION: AUGUST 1960


No comments:

Post a Comment